নারী রাজনীতি: ক্ষমতায়নের পথ, সংকট ও সম্ভাবনার বিশ্লেষণ

হরমুজা বেওয়া

লেখক,শিক্ষক ও নারী অধিকার কর্মী

মে ২১, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতা পূর্বকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, নারীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন, আন্দোলন করেছেন, সংসদে গেছেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেছেন। তবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠে—এই প্রতিনিধিত্ব কি শুধু প্রতীকি, নাকি এটি বাস্তবিক অর্থেই নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিফলন?

 

ঐতিহাসিক পটভূমিতে নারীর অবদান

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের একটি বিশাল অধ্যায় রয়েছে। বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, এবং স্বাধীনতা-উত্তর কালে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মতো নেত্রীদের ভূমিকা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। দুই দশকের বেশি সময় ধরে দুই নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ শাসন করেছেন। এমন নজির পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে।

তবে এই শীর্ষ নেতৃত্বই কি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পরিপূর্ণ চিত্র? না, বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতে এখনও নারীরা নানা বাধা, সহিংসতা, উপেক্ষা এবং পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের শিকার হন।

সংরক্ষিত আসন বনাম সরাসরি নির্বাচন

বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে, যা রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব অনুযায়ী মনোনয়ন দিয়ে পূরণ করা হয়। এটি নারীদের অন্তর্ভুক্তির একটি মাধ্যম হলেও, বাস্তবিক অর্থে তাদের নির্বাচনী মাঠে আসার সুযোগ খুব সীমিত।

অনেকেই বলেন, সংরক্ষিত আসনে থাকা নারী সংসদ সদস্যদের অনেকেই এলাকাভিত্তিক রাজনীতিতে সক্রিয় নন। এতে করে তারা প্রকৃত রাজনীতির মাঠে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন না, ফলে ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই এখন সময় এসেছে—নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ আরও উৎসাহিত করার, এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের নীতিমালা বাস্তবায়ন করার।

 

দলের অভ্যন্তরে নারীর ভূমিকা ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্য দেখা গেলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে নারীদের ভূমিকা অনেকটাই সীমিত। তারা অধিকাংশ সময় সাংগঠনিক, মহিলা বিষয়ক বা প্রটোকল দায়িত্বে থাকেন। দলের শীর্ষ পর্যায়ে খুব কম সংখ্যক নারী উপদেষ্টা, যুগ্ম মহাসচিব বা কেন্দ্রীয় মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন।

এছাড়া স্থানীয় রাজনীতিতে নারী কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান বা জেলা কমিটির নেত্রীদের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অনেকেই পেছন থেকে পুরুষ নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হন—এটি একটি ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়

নারী রাজনীতিকরা এখনো অনেক বাধার সম্মুখীন হন—পারিবারিক বাধা, সামাজিক সমালোচনা, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক সহিংসতা ও হুমকি তাদের সামনে প্রতিদিনের বাস্তবতা। নারী প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে হেনস্থা, ট্রল, কিংবা মানসিক নিপীড়ন আজও রোধ হয়নি।

তবে পরিবর্তনও হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেক শিক্ষিত, সোচ্চার, ও গণমাধ্যম-সচেতন নারী রাজনীতিতে আসছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার, নারী নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের ভূমিকা নিয়ে গর্ব করার মতো দৃষ্টান্ত যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর অসাম্য ও চ্যালেঞ্জের বাস্তবতাও। এখন দরকার প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব থেকে কার্যকর অংশগ্রহণে রূপান্তর। নারীদের শুধু উপস্থিতিই যথেষ্ট নয়—তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, স্বাধীনতা, এবং নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র, তখনই সত্যিকারের প্রগতিশীল হতে পারে—যখন সেই সমাজের নারীরা কণ্ঠস্বর হারিয়ে নয়, বরং নিজেদের অবস্থান তৈরি করে, নেতৃত্ব দেয়। বাংলাদেশ সেই পথেই এগোচ্ছে, তবে গন্তব্য এখনো বহু দূর।

0 মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয়
এক সপ্তাহে নদীতে মিলল ১৭ মরদেহ

দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে গত এক সপ্তাহে ১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। এসব ঘটনায় তিনটি হত্যা মামলা ও ১১টি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) নৌ পুলিশের সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৫ থেকে ২১ মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন নদীপথে অভিযান চালিয়ে এসব মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে নদীপথে অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে মোট ৯৬টি মামলা দায়ের করেছে নৌ পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি হত্যা, ১১টি অপমৃত্যু, ৬৩টি মৎস্য আইন, বেপরোয়া গতি আইনে ১৩টি, একটি বালুমহাল আইন, একটি মাদক আইন, একটি ডাকাতি, একটি অপহরণ, একটি চাঁদাবাজি এবং একটি বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা।   নৌ পুলিশ জানায়, অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ৩০২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া গত সাত দিনে দেশের বিভিন্ন নদীতে অভিযান চালিয়ে ২ কোটি ৩১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭৫ মিটার অবৈধ জাল, ২ হাজার ৮৯ কেজি মাছ, ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০টি বাগদা চিংড়ির রেণু এবং ৪৯০ কেজি জেলিযুক্ত চিংড়ি জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাছ শিকারের জন্য নদীতে স্থাপিত ১৭৯টি অবৈধ ঝোপঝাড় ধ্বংস করা হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ১০৪টি বাল্কহেডের বিরুদ্ধে নৌ-আদালতে মামলা করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি ড্রেজার জব্দ করা হয়েছে। নৌ পুলিশের দাবি, নদীপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অবৈধ মৎস্য আহরণ বন্ধ এবং বিভিন্ন অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদী ও জলজ সম্পদ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

শনিবার খোলা থাকবে ব্যাংক, লেনদেনের সময় কখন

পবিত্র ঈদুল আজহায় আগামী শনিবার (২৩ মে) সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক খোলা থাকবে ও লেনদেনের সময় থাকবে স্বাভাবিক। এছাড়া রোববার ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু থাকবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজারি ডেটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এনালিটিক্স ডিপার্টমেন্ট (এসডিএডি) এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের ধারাবাহিকতায় আগামী শনিবার (২৩ মে) ও রোববার (২৪ মে) তফসিলি ব্যাংকগুলোর সব শাখা ও উপশাখা স্বাভাবিক সময়সূচি অনুযায়ী খোলা থাকবে। এর পরদিন অর্থাৎ সোমবার (২৫ মে) থেকে রোববার (৩১ মে) পর্যন্ত টানা সাত দিন ব্যাংক বন্ধ থাকবে

তৃণমূল নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগঠন শক্তিশালী করতে হবে : খোরশেদ আলম

সাভার পৌর মৎস্যজীবী দলের উদ্যোগে নেতাকর্মীদের নিয়ে সংবর্ধনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাতে পৌর এলাকার উলাইলের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে মিলনমেলায় পরিণত হয় পুরো আয়োজন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক লায়ন মো. খোরশেদ আলম। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি মো. মোখলেছুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সাভার পৌর ছাত্রদল নেতা তাজ খান নাঈম। এসময় সাভার পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডের মৎস্যজীবী দলের নেতাকর্মী, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয় এবং নেতাকর্মীদের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নিয়ে ৩ দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করল কাতার

কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ তুরস্ক, সৌদি আরব ও জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। আলোচনায় মূল গুরুত্ব পেয়েছে পাকিস্তারের নেতৃত্বে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতা উদ্যোগ। শুক্রবার মধ্যরাতে আলজাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানানো হয়, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সালের সঙ্গে আলাপে দুই পক্ষ আঞ্চলিক সংকটের মূল কারণগুলো শান্তিপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তেমনি অন্যান্য দেশও উত্তেজতা কমাতে প্রচেষ্টায় রাজি বলে জানায়। এছাড়া, উত্তেজনা প্রশমনে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সমন্বয়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হাসপাতাল থেকে আসছি, দোয়া করবেন : পলক

জুলাই আন্দোলনের সময় মোহাম্মদপুরে ট্রাকচালক মো. হোসেনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় কারাবন্দি সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে আদালতে হাজির করা হয়েছে। এসময় তাকে ঘাড়ে বেল্ট পরে আসতে দেখা যায়। আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে এসেছি, দোয়া করবেন।’ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাকে প্রিজনভ্যানে আদালতে আনা হয়। প্রিজনভ্যানে থেকে তাকে নামানো হলে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে আসছি, দোয়া করবেন।’

সপ্তাহজুড়ে আলোচিত

এক সপ্তাহে নদীতে মিলল ১৭ মরদেহ
জাতীয়

এক সপ্তাহে নদীতে মিলল ১৭ মরদেহ

naimweb মে ২২, ২০২৬ 1

জনমত জরিপ

বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটি বলে আপনি মনে করেন?